চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী গরুর মাংসের কালা ভুনা রেসিপি: ঘরেই আনুন চট্টগ্রামের মেজবানের স্বাদ!

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী গরুর মাংসের কালা ভুনা রেসিপি:

নাম শুনলেই জিভে জল চলে আসে, আর নাকে লাগে মশলার সেই তীব্র আর মাতাল করা সুগন্ধ! হ্যাঁ, বলছি চট্টগ্রামের গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক, গরুর মাংসের কালা ভুনা'র কথা।
এটি শুধু একটি খাবার নয়, এটি একটি আবেগ, একটি উৎসবের নাম। এর কালো, প্রায় ঝোলবিহীন, গাঢ় মশলায় মাখানো মাংসের প্রতিটি টুকরোয় লুকিয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে যত্ন আর নিখুঁত রান্নার জাদু।

অনেকেই ভাবেন, এমন অসাধারণ স্বাদের চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী গরুর মাংসের কালা ভুনা রেসিপি  কেবল বড় বড় রেস্তোরাঁ বা চট্টগ্রামের বাবুর্চিদের হাতেই সম্ভব। কিন্তু সেই ধারণা আজ বদলে যাবে! আমাদের এই সহজ ও বিস্তারিত রেসিপি অনুসরণ করে আপনিও ঘরে বসেই তৈরি করতে পারবেন নিখুঁত স্বাদের কালা ভুনা।

প্রয়োজনীয় উপকরণ:

মাংস ম্যারিনেশনের জন্য:

  • গরুর মাংস (হাড় ও চর্বিসহ) – ১ কেজি
  • পেঁয়াজ বেরেস্তা – ১ কাপ
  • আদা বাটা – ২ টেবিল চামচ
  • রসুন বাটা – দেড় টেবিল চামচ
  • হলুদ গুঁড়ো – ১ চা চামচ
  • মরিচ গুঁড়ো – ২ চা চামচ (স্বাদমতো)
  • জিরা গুঁড়ো – ১ টেবিল চামচ
  • ধনিয়া গুঁড়ো – ১ টেবিল চামচ
  • গরম মশলা গুঁড়ো – ১ টেবিল চামচ
  • সরিষার তেল – ½ কাপ
  • লবণ – স্বাদমতো 

গোটা গরম মশলা:

  • তেজপাতা – ২টি
  • এলাচ – ৪-৫টি
  • লবঙ্গ – ৫-৬টি
  • দারুচিনি – ২-৩ টুকরো
  • গোলমরিচ – ৮-১০টি

বিশেষ বাগার/ফোঁড়নের জন্য:

  • সরিষার তেল – ¼ কাপ
  • পেঁয়াজ কুচি – ½ কাপ
  • রসুন কুচি – ২ টেবিল চামচ
  • শুকনো লঙ্কা – ৪-৫টি
  • রাধুঁনি গুঁড়ো– ½ চা চামচ (ঐচ্ছিক কিন্তু দিলে আসল স্বাদ আসে)

প্রস্তুত প্রণালী :

মাংস প্রস্তুতি ও ম্যারিনেশন
প্রথমে গরুর মাংস ছোট ছোট টুকরো করে কেটে ভালোভাবে ধুয়ে জল ঝরিয়ে নিন। একটি বড় পাত্রে মাংসের সাথে বাগার দেওয়ার উপকরণ ছাড়া বাকি সব (পেঁয়াজ বেরেস্তা, সব বাটা ও গুঁড়ো মশলা, গোটা  গরম মশলা, লবণ ও সরিষার তেল) দিয়ে খুব ভালোভাবে হাত দিয়ে মেখে নিন। মাংস মাখানো যত ভালো হবে, স্বাদ তত গভীরে পৌঁছাবে। এই অবস্থায় মাংস কমপক্ষে ১ ঘণ্টা ম্যারিনেট করে রাখুন।
মূল রান্না
এবার একটি ভারী তলার হাঁড়ি বা কড়াই গ্যাসে বসিয়ে মাঝারি আঁচে গরম করুন। মাখিয়ে রাখা মাংস সরাসরি হাঁড়িতে দিয়ে দিন। এই সময় কোনো জল যোগ করার প্রয়োজন নেই। মাংস থেকে যে জল বের হবে, তাতেই মাংস সেদ্ধ হতে শুরু করবে। ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিন এবং আঁচ মাঝারি থেকে কিছুটা কমিয়ে রাখুন। প্রতি ১০-১৫ মিনিট পর পর ঢাকনা খুলে নেড়ে দিন যাতে নিচে লেগে না যায়। এই প্রক্রিয়াটি প্রায় ৪০-৫০ মিনিট ধরে চলবে, যতক্ষণ না মাংসের জল শুকিয়ে তেল উপরে ভেসে উঠছে।
মাংস কষানো ও সেদ্ধ করা
মাংসের জল শুকিয়ে তেল ছাড়তে শুরু করলে, মাংস ভালোভাবে কষাতে থাকুন। প্রায় ১৫-২০ মিনিট ধরে কষানোর পর মাংসের রং গাঢ় হতে শুরু করবে। এবার মাংস পুরোপুরি সেদ্ধ করার জন্য পরিমাণমতো গরম জল (প্রায় ২ কাপ) যোগ করুন। ঢাকনা দিয়ে অল্প আঁচে রান্না করুন যতক্ষণ না মাংস পুরোপুরি নরম হয়ে যায় এবং ঝোল একদম শুকিয়ে যায়। এই চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী গরুর মাংসের কালা ভুনা রেসিপি-এর মূল রহস্যই হলো এই দীর্ঘ সময় ধরে রান্না।
স্পেশাল বাগার এবং ফাইনাল টাচ
এটিই কালা ভুনা তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। অন্য একটি প্যানে বা কড়াইয়ে বাগার দেওয়ার জন্য রাখা ¼ কাপ সরিষার তেল গরম করুন। তেল গরম হলে এতে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে সোনালি করে ভাজুন। পেঁয়াজ সোনালি হয়ে এলে রসুন কুচি ও শুকনো লঙ্কা দিয়ে দিন। পেঁয়াজ, রসুন ও লঙ্কা প্রায় কালো হওয়া পর্যন্ত ভাজতে থাকুন। খেয়াল রাখবেন যেন পুড়ে না যায়, কিন্তু রং যেন কালচে বাদামি হয়।
এবার এই গরম বাগারের মিশ্রণটি রান্না করা মাংসের ওপর ঢেলে দিন। সাথে রাধুঁনি গুঁড়ো (যদি ব্যবহার করেন) ছিটিয়ে দিন। এখন খুব অল্প আঁচে আরও ১৫-২০ মিনিট ধরে মাংস নাড়তে থাকুন। এই সময়েই মাংসের রং ধীরে ধীরে কালো হয়ে যাবে এবং কালা ভুনার সেই আসল ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়বে। তেল পুরোপুরি মাংসের ওপরে ভেসে উঠলে বুঝবেন আপনার চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী গরুর মাংসের কালা ভুনা তৈরি।

উপসংহার :

ব্যাস, তৈরি হয়ে গেল আপনার নিজের হাতে বানানো জিভে জল আনা চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী গরুর মাংসের কালা ভুনা রেসিপি। গরম ভাত, পোলাও বা নান রুটির সাথে পরিবেশন করুন এই অসাধারণ ডিশটি।
এই রেসিপিটি শুধু আপনার খাবার টেবিলে একটি নতুন আইটেমই যোগ করবে না, বরং চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও মেজবানের আমেজকেও আপনার ঘরে নিয়ে আসবে। ধৈর্য ধরে প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করলে, আপনার কালা ভুনাও হয়ে উঠবে সবার প্রশংসার পাত্র। তাহলে আর দেরি কেন? আজই চেষ্টা করে দেখুন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url
sr7themes.eu.org